রবিবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং
কৃষকের কথা, প্রধান সংবাদ ঋণ ও প্রযুক্তির সমন্বিত প্রয়োগ ছাড়া টেকসই কৃষি উন্নয়ন সম্ভব নয়।

ঋণ ও প্রযুক্তির সমন্বিত প্রয়োগ ছাড়া টেকসই কৃষি উন্নয়ন সম্ভব নয়।


পোস্ট করেছেন: নিউজ ডেস্ক | প্রকাশিত হয়েছে: ১০/১৪/২০১৯ , ১২:১৭ পূর্বাহ্ণ | বিভাগ: কৃষকের কথা,প্রধান সংবাদ


ঋণ ও প্রযুক্তির সমন্বিত প্রয়োগ ছাড়া টেকসই কৃষি উন্নয়ন সম্ভব নয়।

নিতাই চন্দ্র রায়
টেকসই কৃষি উন্নয়ন ঃ‘ একটি গ্রাম জাগলে, একটি দেশ জাগবে।’ এই জীবন দর্শন রবীন্দ্রনাথকে তাঁর পল্লী উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে উদ্বুদ্ধ করেছিল। বিশ্বকবি বরীন্দ্রনাথ ঠাকুর কৃষি উন্নয়নকে গ্রামের অর্থনৈতিক উন্নয়নের চাবিকাঠি বলে জানতেন।
সেজন্য নানা প্রকল্পও গ্রহণ করেছিলেন তিনি। তাঁর জমিদারিতে কৃষি এবং কৃষি সম্পর্কিত নানা কর্মকা-ের উন্নয়নের জন্য তিনি তাঁর নোবেল পুরস্কারের সকল অর্থ দিয়ে কৃষি ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি রাশিয়ার অনুরূপ কৃষি ক্ষেত্রে একত্রিকরণের পরিকল্পনাও করেছিলেন এবং তা বাস্তবায়নের জন্য পদক্ষেপও গ্রহণ করেছিলেন। তিনি কৃষির পাশাপাশি শিল্পের উন্নয়নও করতে চেয়ে ছিলেন।তিনি তাঁত শিল্প, রেশম শিল্প ও চিনি শিল্পের উন্নয়নের জন্য প্রকল্পও গ্রহণ করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ খাদ্যাভাসেও পরিবর্তন আনতে চেয়ে ছিলেন এবং তাঁর কর্মক্ষেত্রে আলু চাষেরও ব্যবস্থা নিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ বলতেন,‘ চাষীকে আত্মশক্তিতে দৃঢ় করে তুলতে হবে-এই ছিল আমার অভিপ্রায়। এ সম্পর্কে দুটো কথা সব সময় আমার মনে আন্দোলিত হয়েছে – জমির স্বত্ব ন্যায়ত জমিদারের নয় -সে চাষির। দ্বিতীয়ত, সমবায় নীতি অনুসারে চাষের ক্ষেত্রে একত্র করে চাষ না করতে পারলে কৃষির উন্নতি হতেই পারে না। মান্দাতার আমলের হাল লাঙল নিয়ে আলবাঁধা টুকরো জমিতে ফসল ফলানো আর ফুটো কলসিতে জল আনা একই কথা।’ রবীন্দ্রনাথ অনুধাবন করেছিলেন, পল্লীর উন্নয়ন কৃষির সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। উন্নত প্রথার কৃষির ব্যবস্থা না হলে পল্লী অঞ্চলে প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। এ জন্য তিনি তাঁর কনিষ্ঠ জামাতা নগেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়কে কৃষি শিক্ষার জন্য ইলিয়ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়ে ছিলেন। শিক্ষা শেষে জামাতা নগেন্দ্রনাথ এবং পুত্র রথীন্দ্রনাথ দেশে ফিরে আসলে রবীন্দ্রনাথ তাঁদেরকে শিলাইদহে কৃষি উন্নয়নের কাজে নিয়োজিত করেন।
বরীন্দ্রনাথ আরও বলতেন, ‘ আমাদের দেশে আমাদের পল্লীতে ধান উৎপাদন ও পরিচালনার কাজে সমবায় অপরিহার্য।’ শিলাইদহে তিনি তাঁর এই ইচ্ছাকে কাজে লাগিয়ে ছিলেন। এখানে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জমিকে একত্রিত করে সমবায়ের মাধ্যমে ফসল উৎপাদনের কাজে হাত দিয়ে ছিলেন এবং কৃষি ব্যাংক স্থাপন করেছিলেন।

বাংলাদেশে বড় কৃষকের সংখ্যা মোট কৃষকের শতকরা ২ভাগ , মাঝারি কৃষক ১৮ ভাগ এবং ক্ষুত্র ও প্রান্তিক কৃষকের সংখ্যা শতকরা ৮০ ভাগ । ধান, আলু, ভুট্টা , শাকসবজি ও ফল উৎপাদনে বাংলাদেশে আজ যে বিস্ময়কর সফলতা অর্জিত হয়েছে- সে কৃতিত্বের দাবিদার – এই ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকেরাই।এসব কৃষকেরই ফলন বেশি। তাঁরাই কৃষির আধুনিক প্রযুক্তি সময় মতো মাঠে প্রয়োগ করেন।সময় মতো ফসলের পরিচর্যা করেন। পোকা-মাকড় ও রোগবালই দমন করেন। জমি তৈরি, বীজ, সার ও বালাইনাশক ক্রয়, সেচ প্রদান, আগাছা দমনসহ নানা কাজে কৃষকের নগদ অর্থের প্রয়োজন হয়। কৃষক তখন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ( এনজিও), সুদখোর মহাজন ও আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হন। খাদ্যনীতি পারমর্শ বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টার ন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট( ইফপ্রি) বলছে, এনজিও , আত্মীয়স্বজন , বেসরকারি ব্যাংক ও দাদন ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন বেসরকারি উৎস থেকে কৃষক ৮১ শতাংশের বেশি ঋণ গ্রহণ করেন। কী ভয়ংকর কথা! এসব ঋণের সুদের হার ১৯ থেকে ৬৩ শতাংশ। তাহলে কৃষক বাঁচে কীভাবে? আর সরকারের কৃষি ব্যাংক ৯ শতাংশ সুদে যে ঋণ দেয়, তা কৃষক খুব সামন্যই পান। কৃষকের মোট ঋণের মাত্র ৬ শতাংশ আসে কৃষি ব্যাংক থেকে। ২০১৫ সালে করা ওই সমীক্ষার সুপারিশ গত ২০ মে কৃষি মন্ত্রণালয়ের কাছে উপস্থাপন করে ইফপ্রি। সংস্থাটি বলছে, কৃষকে লোকসান থেকে বাঁচাতে হলে কম সুদে ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। কৃষি শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি ও উচ্চ সুদে ঋণ গ্রহণের ফলে ধানের উৎপাদন খরচও প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে অনেক বেশি। ভারতে কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসেবে, দেশটিতে চলতি বছর প্রতিকেজি ধানের উৎপাদন খরচ হয়েছে বাংলাদেশী মুদ্রায় ১৮ টাকা ৭৫ পয়সা। আর সরকারি সংগ্রহ মূল্য ২০ টাকা ৮০ পয়সা। অন্যান্য প্রধান ধান উৎপাদনকারী দেশ থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামে এবছর প্রতি কেজি ধান উৎপাদনে খরচ পড়েছে ২০ টাকারও কম। অন্যদিকে বাংলাদেশে প্রতি কেজি ধানের উৎপাদন খরচ পড়েছে ২৫ টাকা এবং সরকার নির্ধারিত ক্রয় মূল্য ২৬ টাকা। কৃষক সরকারের কাছ থেকে যেমন ঋণ কম পাচ্ছেন , তেমনি সরকার কৃষকের কাছ থেকে ধানও কিনছে কম। মাত্র ৪ লাখ মেট্রিক টন ধান এবারের বোরো মৌসুমে কৃষকের কাছ থেকে সংগ্রহ করবে সরকার।

আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবছর বোরো ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। আশা করা যায়, উৎপাদন গত বারের ১ কোটি ৯৬ লাখ মেট্রিক টনকেও ছাড়িয়ে যাবে। বোরো ধান কাটার সময় প্রতিবারের মতো এবারও শ্রমিকের সংকট ছিল তীব্র। এলাকা ভেদে প্রতিজন কৃষি শ্রমিককে দিনে মজুরি দিতে হয়েছে

53 total views, 1 views today

Comments

comments

Close