রবিবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং
কৃষকের কথা, প্রধান সংবাদ বন্যাত্তোর কৃষি পুনর্বাসন ও টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা।

বন্যাত্তোর কৃষি পুনর্বাসন ও টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা।


পোস্ট করেছেন: নিউজ ডেস্ক | প্রকাশিত হয়েছে: ১০/১৪/২০১৯ , ১২:১১ পূর্বাহ্ণ | বিভাগ: কৃষকের কথা,প্রধান সংবাদ


বন্যাত্তোর কৃষি পুনর্বাসন ও টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা

নিতাই চন্দ্র রায়
বন্যাত্তোর কৃষি পুনর্বাসন ঃ জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব-খরা, বন্যা, ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে বাংলাদেশে কৃষি ও কৃষকের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়। বন্যায় মাঠের ফসল তলিয়ে যায়। পানির প্রবল ¯্রােতে ভেসে যায় পুকুরের মাছ। ভেঙ্গে যায় বাড়িঘর । পাহাড়ি ঢল, উজান থেকে নেমে আসা অতিরিক্ত পানি, অতিবৃষ্টি ও পলিপড়ে নদীগুলির তলদেশ ভরাট হওয়ায় ৮থেকে ১০ বছর পরপরই বাংলাদেশে ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হয়। বন্যার সাথে যুদ্ধ করেই বেঁচে আছে এদেশের কৃষক, মৎস্য চাষি এবং দুগ্ধ ও পোল্ট্রি খামারিরা যুগযুগ ধরে।

অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে দেশের উত্তরাঞ্চল এবং সিলেট ও পার্বত্য চট্টগ্রামের নিচু এলাকায় বন্যা শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে নদ-নদীতে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় উত্তরাঞ্চল পেরিয়ে মধ্যাঞ্চলেও বন্যা দেখা দেয়। এবারের বন্যায় ৩১ টি জেলায় কৃষি , মৎস্য ও প্রাণি সম্পদের ব্যাপক ক্ষতি হয়। ক্ষতি হয় রাস্তাঘাট, বাড়িঘর ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের । তিন সপ্তাহের বেশি সময় ধরে এই বন্যায় সাড়ে ছয় লাখেরও বেশি কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। টাকার অংকে এই ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি । বন্যায় ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা যায়। মন্ত্রণালয়ের মতে, বন্যায় আদ্যাবধি ৩১ টি জেলায় প্রায় ১ লাখ ৭২ হাজার হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নষ্ট হয়েছে ৩ লাখ ২৮ হাজার টন বিভিন্ন ধরনের শস্য। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে আউস ধানের। ৯৭ হাজার ১৮৪ জন কৃষকের ৫০ হাজার ৬০২ হেক্টর জমির আউসের ক্ষতি হয়েছে ২৫২ কোটি টাকা। এছাড়া ৯৫ হাজার ৫৭০ জন কৃষকের ২৫৯ কোটি ৭০ লাখ টাকার পাট ও ৮৮ হাজার ৪০৮ জন কৃষকের ১৫৪ কোটি ৮৩ লাখ টাকার বোনা আমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবারের ভয়াবহ বন্যায়। বন্যায় আমন ধানের বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১৬ হাজার ৬৫৫ হেক্টর । এতে ২ লাখ ৫৫ হাজার ৯৮৬ জন কৃষকের ক্ষতি হয়েছে ১২৬ কোটি টাকা। এছাড়া গ্রীষ্মকালীন সবজি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় প্রায় ১ লাখ কৃষকের ক্ষতি হয়েছে ২৯০ কোটি টাকা।

এবারে বন্যায় পানি নামছে অত্যন্ত ধীর গতিতে। একারণে বন্যার প্রভাব আরও দীর্ঘ হতে পারে। ফলে আউস , আমন, পাট ও গ্রীষ্মকালীন সবজি উৎপাদন বিঘিœত হতে পারে। বন্যায় চিনিকল ও চিনিকল বর্হিভুত এলাকার চরাঞ্চলের আখ ফসলেরও ক্ষতি হয়েছে বেশ। বন্যায় কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, রংপুর ও বগুড়া জেলায় কৃষি, মৎস্য , দুগ্ধ ও পোল্ট্রি খামারিদের বেশি ক্ষতি হয়েছ। কুড়িগ্রামে ১৫৬ কোটি টাকার ফসলের ক্ষতি হয়েছে বন্যায়। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১ লাখ ৭৫ হাজার কৃষক পরিবার। আমন ধানের বীজতলা নষ্ট হওয়াতে সংকট দেখা দিয়েছে আমন চারার। এবারের বন্যায় গাইবান্ধা জেলায় ১৪ হাজার ২১ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। টাকার অংকে এই ক্ষতির পরিমাণ ৯২ কোটি ১ লাখ ১৭ হাজার। ক্ষতি পুষিয়ে নিতে জেলায় একশ’ একর জমিতে আমন বীজতলা স্থাপন করা হয়েছে। উৎপাদিত চারা বিনা মূল্যে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করা হবে। এছাড়া চারা তৈরি করে ধান রোপণের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মধ্যে ৫ কেজি করে আমন ধানের বীজ বিতরণ করা হয়েছে। সিরাজগঞ্জে ১৪৩ কোটি টাকার ফসলের ক্ষতি হয়েছে। বন্যায় মাছ চাষিদেরও অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। বগুড়া জেলায় পাঁচ হাজারের বেশি পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। একই সঙ্গে ভেসে গেছে কয়েকটি বিলে চাষ করা মাছ। ভেসে যাওয়া এসব মাছের আনুমানিক মূল্য ৫০ কোটি টাকারও বেশি এবং মৎস্য চাষির সংখ্যা ৪ হাজার ৩৮১ জন। বন্যায় গাইবান্ধা জেলায় মাছ চাষেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। জেলার ৭টি উপজেলার ৭ হাজার ৫০টি খামার ও পুকুর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৮ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। ক্ষতিগ্রস্ত মাছ চাষিদের কথাÑ সরকারি অনুদান বা সহযোগিতা না পেলে নতুন করে মাছ চাষ শুরু করা তাদের পক্ষে সম্ভব হবেনা । এজন্য প্রয়োজন স্বল্প সুদে ও সহজ শর্তে মৎস্য ঋণ।

বন্যার ক্ষতি পোষাতে কৃষকদের প্রণোদনা সহায়তা দেয়া হবে বলে জানান কৃষি মন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক।তিনি বলেন, এবারের বন্যায় তেমন ক্ষতি হয়নি । বন্যার আগেই মূল ফসল কৃষকের ঘরে উঠেছে। এরপরও কৃষির যে পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তা কাটিয়ে উঠতে কৃষকদের প্রণোদনা সহায়তা দেয়া হবে। বন্যা পরবর্তীতে কৃষি পুনর্বাসন করার জন্য কৃষককে বিনামূল্যে সার, বীজ প্রদান করা হবে । কৃষি প্রণোদনার জন্য ১২০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে । বন্যার ক্ষতির সাথে কিছু উপকারী দিকও রয়েছে। বন্যার ফলে কৃষি জমিতে প্রচুর পলিমাটি পড়ে এবং বালাইনাশক ও রাসায়নিক সারের বিষাক্ততা হ্রাস পায়। ফলে কৃষি জমির উর্বরতা শক্তি বৃদ্ধি পায়।এ কারণে বন্যা পরবর্তী সময়ে ফসলের বাম্পার ফলন হয়। বন্যার ফলে প্রাকৃতিক জলাশয়ে মাছের প্রজনন ও উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। এ সময় পাট জাগ দেয়ার জন্য খালে-বিলে প্রচুর পানি পাওয়া যায়।

40 total views, 1 views today

Comments

comments

Close