দক্ষিণ বাংলায় শিক্ষা বিস্তার ও জনসেবায় এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম আব্দুল মোতালেব

দক্ষিণ বাংলায় শিক্ষা বিস্তার ও জনসেবায় এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম আব্দুল মোতালেব

বাসুদেব দাশ।।
স্টাফ রিপোর্টার
দক্ষিণ বাংলায় শিক্ষা বিস্তার ও জনসেবায় আব্দুল মোতালেব একটি নাম, একটি অধ্যয়, এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। শিক্ষা জীবন শেষে চাকুরীর সুবাদে পাকিস্তানের করাচীতে অবগহান করেন। কিন্তু পরের জন্য যার জীবন উৎসর্গ তিনি কি ব্যক্তি স্বার্থে চাকুরী নিয়ে থাকতে পারেন। তাই তো নিজের সুখের কথা চিন্তা না করে চাকুরী ছেড়ে চলে এলেন সাতক্ষীরায়। কি কারণে চাকুরী ছাড়লেন? প্রশ্ন অনেকের। সে প্রশ্নের উত্তর আজ সাতক্ষীরাবাসী তথা দক্ষিণ বাংলার মানুষের অজানা নয়। অনগ্রসর, শিক্ষায় পশ্চাদপদ সাতক্ষীরাকে শিক্ষায় এগিয়ে নিয়ে যাওয়া ও জনসেবার মাধ্যমে দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোঁটানোর ব্রত নিয়ে এগিয়ে আসেন জনাব আব্দুল মোতালেব।

স্বাধীনতাত্তোর সাতক্ষীরাকে শিক্ষায় আলোচিত করতে প্রথমে তিনি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু করেন। সাতক্ষীরা জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে হাঁটু কাদা ভেঙ্গে পায়ে হেঁটে প্রতিষ্ঠা করেছেন শত শত প্রাথমিক বিদ্যালয়। বিশেষ করে সাতক্ষীরা সদর ও তালা উপজেলার অধিকাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয় তাঁরই নিজস্ব উদ্দ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সে সময় বহু শিক্ষিত যুবককে তিনি বাড়ী থেকে ডেকে এনে এসব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চাকুরী দিয়েছেন।

প্রবল আত্মশক্তি ও আগ্রহ নিয়ে পথ চলা আব্দুল মোতালেব সাহেব চিন্তা করলেন প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করে এসব শিক্ষার্থীর আর শিক্ষা অর্জন হবে না। তাই তিনি হাই স্কুল প্রতিষ্ঠার কাজে আত্মনিয়োগ করলেন। তিনি শহরে, গ্রামে-গঞ্জে হাই স্কুল প্রতিষ্ঠার ব্রত নিয়ে এগিয়ে চলেন দুর্বার গতিতে। প্রতিষ্ঠা করেন অসংখ্য হাই স্কুল। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য স্কুল গুলো হল-সাতক্ষীরা নবারুণ গার্লস হাই স্কুল, তালতলা হাই স্কুল, কুমিরা পাইলট গার্লস হাই স্কুল। এসব স্কুলে অসংখ্য শিক্ষিত বেকার যুবকদের চাকুরী দিয়েছেন তিনি। তারা আজ সমাজে সম্মানিত ও প্রতিষ্ঠিত।

কর্মবীরের জীবন থেমে থাকে না। কাজ করে যিনি আনন্দ পান, সমাজকে যিনি কিছু দিতে চান তিনি কি থেকে থাকতে পারেন। কর্মবীর আব্দুল মোতালেব গভীর ভাবে উপলব্ধি করলেন হাই স্কুলের পাঠ শেষ করে হয়ত দুর-দরন্তে সব ছেলে মেয়েরা কলেজে পড়তে পারবে না। তাই শিক্ষা বিস্তারের অদম্য নেশায় মেতে উঠলেন কলেজ প্রতিষ্ঠায়। এ কর্মবীরের দক্ষ হাতের নিপুন স্পর্শে তৈরি করতে লাগলেন কলেজ। তাঁর প্রতিষ্ঠিত কলেজ গুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল-সাতক্ষীরা সরকারী মহিলা কলেজ, সাতক্ষীরা সিটি কলেজ, সাতক্ষীরা দিবা-নৈশ কলেজ, কুমিরা মহিলা ডিগ্রি কলেজ, তার মমতাময়ী মায়ের নামে ছফুরননেছা মহিলা ডিগ্রী কলেজ। এসব কলেজে শত শত উচ্চ শিক্ষিত বেকার যুবক অধ্যাপনা করছেন এবং আজ সামাজিকভাবে তারা সম্মানিত ও প্রতিষ্ঠিত। যা কর্মবীর আব্দুল মোতালেবেরই এক অবদান। তিনি যখন কুমিরা মহিলা কলেজ প্রতিষ্ঠা করে বলেছিলেন এ কলেজের মেয়েরা একদিন পান্তাভাত খেয়ে এখান থেকে এম.এ পাশ করবে। তাঁর সেই স্বপ্ন আজ পূরণ হয়েছে। কুমিরা মহিলা কলেজে বর্তমানে আটটি বিষয়ে অনার্স ও ১টি বিষয়ে মাস্টার্স কোর্স চালু আছে। যেখান থেকে সত্য সত্যই মেয়েরা এম.এ পাশ করে সমাজের বিভিন্ন জায়গায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

তিনি যখন অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি। জীবন সাহাহ্নে দাঁড়িয়ে তিনি বার বার খোঁজ নিয়েছেন তাঁর প্রতিষ্ঠিত কলেজ গুলো কেমন চলছে। স্কুল কলেজ প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে জড়িত ছিলেন। সাংবাদিকতা জগতে তিনি ছিলেন উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি সাতক্ষীরা প্রেসকাবের বার বার সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। নির্বাচিত হয়েছিলেন বাংলাদেশ সাংবাদিক সমিতির সভাপতি। বাংলাদেশ টেলিভিশনের সাতক্ষীরা জেলা প্রতিনিধি, বাংলাদেশ অবজারভারের সাতক্ষীরা প্রতিনিধিও ছিলেন আব্দুল মোতালেব। তিনি বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির কেন্দ্রীয় কমিটির বার বার মেম্বর নির্বাচিত হয়ে সাতক্ষীরা রেডক্রিসেন্ট ইউনিটের সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন নিষ্ঠার সাথে। সাতক্ষীরার ভয়াবহ বন্যার চিত্র বাংলাদেশ টেলিভিশনে তুলে ধরে রেডক্রিসেন্টের মাধ্যমে অনেক আর্থিক সাহায্য নিয়ে এসেছিলেন বর্ণার্ত্য ও দুর্গত মানুষের জন্য। যা সাতক্ষীরাবাসী আজও কৃতজ্ঞতার সাথে স্বীকার করে। তাঁর প্রতিষ্ঠিত “দৈনিক কাফেলা” পত্রিকা আজও সাতক্ষীরা বাসীর আকাক্সক্ষার প্রতিচ্ছবি হয়ে সাতক্ষীরায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি বলতেন ‘দৈনিক কাফেলা’ দক্ষিণ অঞ্চলের ইত্তেফাক হিসেবে পরিচিতি লাভ করবে। এই কাফেলা অফিসে মুড়ি, বাদাম আর চায়ে আপ্যায়িত হননি এমন লোক সাতক্ষীরায় খুবই কম আছেন। কাফেলার এই জরাজীর্ণ গোলপাতার অফিসের চাল থাকতো ঝুলে ভরা অথচ কোন প্রতিষ্ঠানে যখন তিনি যেতেন তখন কোন জায়গায় সামান্য ঝুল থাকলে তিনি প্রতিষ্ঠানের প্রধান সহ অন্যান্যদের কিছুটা বকাবকি করতেন এবং পরিস্কার করার নির্দেশ দিতেন। অথচ নিজের অফিসের বেহাল দশা। শেষে কবির ভাষায় বলতে হয়।

“পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি
এজীবন মন সকলি দাও।
তার মত সুখ কি আছে?
আপনার কথা ভুলিয়া যাও।”

কবির এই মর্মবাণী আব্দুল মোতালেব নিজের জীবনের পাতায় পাতায় লিখেছিলেন বলেই পরের জন্য তিনি জীবন উৎসর্গ করে গেছেন। যতদিন দক্ষিণ বাংলার মাটি মানুষ থাকবে ততদিন এ কর্মে বীর বেঁচে থাকবে সকলের মাঝে।

777 total views, 3 views today

Comments

comments

     More News Of This Category

Our Like Page

Close